কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০১৯ এ ১০:৩৩ PM
কন্টেন্ট: পাতা
| উকিল মুন্সী | |
|---|---|
| জন্ম | আব্দুল হক আকন্দ ১১ জুন ১৮৮৫ নূরপুর বোয়ালী |
| মৃত্যু | ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৮ (বয়স ৯৩) |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশী |
| পেশা | বাউল |
| যে জন্য পরিচিত | গীতিকবি |
| দাম্পত্য সঙ্গী | হামিদা খাতুন |
| সন্তান | সাত্তার মুন্সী (ছেলে) |
নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ির নূরপুর বোয়ালীগ্রামে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন একটি ধনাঢ্য মুসলিম পরিবারে উকিল মুন্সী জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম আব্দুল হক আকন্দ। শৈশবে তিনি ঘেটুগানে যোগ দেন। পরে গজল ও পরিণত বয়স থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাউল সাধনায় লিপ্ত থাকেন। তাঁর গজল গানের সূত্রপাত হয় তরুণ বয়সে। তাঁর চাচা কাজী আলিম উদ্দিনের বাড়ি মোহনগঞ্জ থানার জালালপুর গ্রামে বেড়াতে যান। সেখানে ধনু নদী পারের এক গ্রামের লবু হোসেনের মেয়ে হামিদা খাতুনের (লাবুশের মা) প্রেমে পড়ে যান তিনি। এই প্রেম নিয়ে তিনি লিখেন "উকিলের মনচোর" নামক একটি গান। তাঁর চাচা এই প্রেমের কথা জানার পর হামিদার বাবা সাধারণ কৃষক হওয়ায় তাকে পরিবার থেকে বাঁধা দেন। তিনি বাড়ি ছেড়ে শ্যামপুর, গাগলাজোড়, জৈনপুরে ঘুরে বেড়ান। ১৯১৫ সালে জালালপুর গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের এক মসজিদে ইমামতি ও আরবি পড়ানোর কাজে নিযুক্ত হন। এই সময়ে ইমামতির পাশাপাশি গজল লিখতেন এবং রাত জেগে তা গাইতেন। এতে বিরক্ত হয়ে এক ব্যক্তি পুলিশের কাছে নালিশ করে। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যেতে আসলে উকিল পুলিশ নিয়ে গান ধরেন। সে গানে পুলিশ তার নিজের ভিতরে লুকোনো কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় এবং পরে কয়েকটি পালাগানের মঞ্চে উকিলের গান শুনে পুলিশ উকিলের মুরিদ হয় যায়। ১৯১৬ সালে হামিদা খাতুনের আগ্রহে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক পুত্র, সাত্তার মুন্সী।
উকিল মুন্সীর অনেক জনপ্রিয় গান আজও উচ্চারিত হয় সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গানঃ[৫]
১৯৭৮ সালের মাঝামাঝিতে উকিল মুন্সীর স্ত্রী হামিদা খাতুন এবং এর কয়েক মাস পর ছেলে সাত্তার মুন্সী মৃত্যুবরণ করেন। সে বছরই তিনি অসুস্থ হয়ে ১২ ডিসেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর অনেক গান বাংলা চলচ্চিত্রে সংযোজন হয়েছে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় নির্মিত শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রে বারী সিদ্দীকীর কণ্ঠে ব্যবহার করেন উকিলের গান। বিংশ শতাব্দীর গ্রামীণ বাংলার জীবনকে নিয়ে রচিত হুমায়ুন আহমেদের বহুকেন্দ্রিকা উপন্যাস মধ্যাহ্ন-এর অন্যতম চরিত্র উকিল মুন্সী।লোকশিল্পী মমতাজ তার সুললিত কন্ঠে " সুজন বন্ধু রে আরে ও বন্ধু, কোন বা দেশে থাকো, এই দাসীরে কান্দাইয়া রে, কোন দাসীর মন রাখো সুজন বন্ধুরে " এই গানটি গেয়ে জনপ্রিয় করে তোলেন।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের জৈনপুর গ্রামে উকিল মুন্সীর স্মরণে তার জীবন ও গান নিয়ে আলোচনা, প্রবন্ধ পাঠ, তার রচিত জনপ্রিয় গানের সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে "উকিল মুন্সী স্মৃতি সংসদ"।
‘উনি আমাকে বাবার স্নেহ আদর ভালোবাসা দিয়ে লালনপালন করেছিলেন। আমি উনার কাছে কোরান-হাদিস পড়েছি, তিনিই আমাকে সব দিয়েছেন। আমি তো তাঁর কবরকে অযত্নে রেখে যেতে পারি না। তাছাড়া উনার কবরের পাশেই আমার স্বামীর কবর! দুটি কবরকে অযত্নে রেখে স্বামীর ভিটা খালি ফেলে, কোথায় যাবো আমি? যতদিন হায়াত আছে, বাকি জীবনটা এখানেই কাটিয়ে দিতে চাই।’
কথাগুলো ছলছল চোখে যন্ত্রণা নিয়ে বলছিলেন চার সন্তানের জননী বিখ্যাত বাউল কবি ফুলবানু সাত্তার। কবরগুলোর পাশে বসে স্বামী-শ্বশুরকে সাক্ষী রেখেই যেন কথাগুলো বলা তাঁর। চরম দরিদ্রতার মধ্যে একটি ভাঙা কুঁড়েঘরে কোনোরকম টিকে থাকা এক দৃঢ়চেতা গীতিকবির অভিব্যক্তি এটি। ফুলবানু আবেগাক্রান্ত কণ্ঠে পরম শ্রদ্ধায় যাঁর উদ্দেশে কথাগুলো বলেছেন, তিনি হলেন ভাটিবাংলার বাউল সাধক আব্দুল হক আকন্দ ওরফে উকিল মুন্সি।
নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী থানার বোয়ালি গ্রামে বাবা গোলাম রসুল আকন্দ ও মাতা উকিলেন্নেসার ঘর আলোকিত করে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন আব্দুল হক আকন্দ উকিল জন্মগ্রহণ করেন। দু’ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। শিশুকালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়, ফলে মায়ের সাথে দু’ ভাইয়ের বসবাস বেশিদিন সম্ভব না হওয়ায় কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার ঠাকুরবাড়িতে ফুফুর কাছে আশ্রয় নেন। ফুফু তাঁর হূদয়ের সবটুকু উত্তাপ দিয়ে ভালোবাসলেও স্বামীর সংসারের বৈরিতার কারণে শেষপর্যন্ত তাঁদেরকে আগলে রাখতে পারেননি। পারেননি ভাইয়ের পুত্রদের পড়াশোনা করাতে। আর এই বৈরী পরিবেশ চির আবেগী উকিল মুন্সিকে তিলে তিলে গড়ে তোলে সংগ্রামী এক অনন্য মানুষে। তারপর থেকেই শুরু হয় নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে জীবনের রস আস্বাদনের। উকিল মুন্সির বয়স তখন ১৫-১৬ হবে। পিতামাতাহারা স্বাধীন একজন মানুষ তিনি। এই স্বাধীনতা, বৈরী পরিবেশে ফুফুর অপারগতা উকিলকে ঠেলে দেয় ঘাটুগানের দিকে। তখন ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চলে অর্থাত্ ভাটি অঞ্চলটিতে ঘাটুগানের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। রাতদিন তিনি ঘাটুগান শোনেন, গানের দলের সাথে থাকেন আর আয়ত্ত করেন ঘাটুগানের কৌশল। কিছুদিন পর উকিল মনস্থির করলেন, তিনি নিজেই ঘাটুগান করবেন! শুরুও করে দিলেন। এত সুমধুর সুরে ওই অঞ্চলের মানুষ এর আগে কখনো ঘাটুগান শোনেনি। দর্শক-শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাতব্যাপী শুনতেন উকিল মুন্সির ঘাটুগান।
বাংলার লোকসংগীতের অনন্য উজ্জ্বল শাখা ঘাটুগান। ঘাটুগান সম্পর্কে লোকশ্রুতি আছে—ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে গাওয়া হতো বলেই একে ঘাটুগান বলা হয়। কিন্তু ঘাটুগান সম্পর্কে লোকসাহিত্য সংগ্রাহক গোলাম এরশাদুর রহমান তাঁর ‘নেত্রকোনার লোকগীতি পরিচয়’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ঘাটু নামকরণ সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে আদিকালের সমঝদারদের বক্তব্য ছিল—কৃষ্ণের বাঁশির ঘাট শব্দ থেকে ঘাটু নামকরণ হয়। কারণ ঘাটু ছেলেটিকে মূলত নাচে ও গানে নিয়ন্ত্রণ করে বাঁশি’। শিক্ষিত সমাজে এ গানকে ঘাটুগান নামে ডাকলেও বিভিন্ন অঞ্চলভেদে এর আঞ্চলিক নাম রয়েছে যেমন : ঘেঁটু, গেন্টু, ঘাডু, গাটু, গাডু ইত্যাদি। সুনামগঞ্জের জলসুখা গ্রামের বাউল-আখড়ায় এ গান প্রথম শুরু হলেও নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট তথা গোটা হাওড় অঞ্চল ছিল এ গানের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
মূলত অল্প বয়সের সুদর্শন কোনো কিশোরকে ঘাটু বানানো হতো। সে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, মান-অভিমান, বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা, বিরহ-মিলনকে কখনো ছেলে, কখনো মেয়ে সেজে নেচে নেচে সুরে-তালে প্রকাশ করত অপরূপ ভঙ্গিমায়। ঘাটুকে ঘিরেই সম্পূর্ণ দলটি আবর্তিত হতো। ঘাটুগান নিয়ে লোকসমাজে প্রচুর মুখরোচক আলোচনাও রয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদে উকিল মুন্সি ঘাটুগানে সম্পৃক্ত হলেও বিষয়টি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ছিল না বলে পরবর্তীসময়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে তিনি নেত্রকোনা জেলার ভাটি এলাকার বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি করেন এবং মসজিদসংলগ্ন পাড়ার শিশুদের কোরান হাদিস শিক্ষাদানে নিয়োজিত হন। নিজে পিতৃহারা ছিলেন বলেই হয়তো শিশু-কিশোরদের প্রতি ছিল তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসা। সকল শিশু-কিশোরকেই সন্তানতুল্য স্নেহ-ভালোবাসায় শিক্ষা দিয়েছেন কোরান-হাদিস। পাশাপাশি ভাবের জগতেও টেনেছেন অনেককে। মদন থানার কুলিয়াটি গ্রামে ইমামতি করার সময়ে তাঁর ভাবশিষ্য হয়ে সুনামের সঙ্গে দীর্ঘ সময় গান করেছেন হূদয় সরকার, ধনাই খাঁ, আব্দুল জলিল, আবু চাঁন, নুরুল ইসলাম ফকির, ফুলবানুসহ অনেকেই। এরকম নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ এলাকায় তাঁর ভাবশিষ্য প্রচুর তৈরি হয় ওই সময়ে। ফুলবানুকে তিনি এতই স্নেহ করতেন যে, পরবর্তীসময়ে নিজের পুত্রবধু করে ঘরে আনেন। মসজিদে ইমামতি পেশায় থাকার কারণে উকিল নামের সাথে মুন্সি শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়। বিস্ময়ের বিষয় এই যে, উকিল মুন্সি ইমামতির পাশাপাশি বাউল গান, মালজোড়া গান, পালাগানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন স্বমহিমায়। মানুষ তাঁর এই দ্বৈতসত্তাকে মেনেও নিয়েছিল অন্তরের অন্তস্থল থেকে। কারণ সাধকসম্রাট উকিল মুন্সির কণ্ঠে উঠে এসেছিল ভাটিবাংলার মানুষের চিরায়ত প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-বিচ্ছেদ তথা আধ্যাত্ম চেতনার মৌলিক দিকগুলো। যেমন তাঁর গানে—
আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়া রে করো তোমার মনে যাহা লয়। ঐ
পাষাণ বন্ধু রে
বলেছিলে আমার হবে
মন দিয়াছি এই ভেবে
সাক্ষী কেউ ছিল না সেই সময় ও বন্ধু রে।
সাক্ষী শুধু চন্দ্রতারা
একদিন তুমি পড়বে ধরা রে বন্ধু
ত্রিভুবনের বিচার যেদিন হয়। ঐ
পাষাণ বন্ধু রে
দুঃখ দিয়া হিয়ার ভিতর
একদিন ও না লইলে খবর
একি তোমার প্রেমের পরিচয় ও বন্ধু রে।
মিছামিছি আশা দিয়া
কেন বা প্রেম শিখাইয়া রে বন্ধু
দূরে থাকা উচিত কি আর হয়। ঐ
পাষাণ বন্ধু রে
বিচ্ছেদের বাজারে গিয়া
তোমার প্রেম বিকি দিয়া
করবো না প্রেম আর যদি কেউ কয় ও বন্ধু রে
উকিলের হইয়াছে জানা
কেবলি চোরের কারখানা রে বন্ধু
চোরে চোরে বেওয়াইয়ালা হয়। ঐ
আল্লাহ-রাসুল, প্রেম-ভালোবাসাকে অনুষঙ্গ করে বিচ্ছেদ-বর্ণনায় উকিল মুন্সি ছিলেন এক অনন্য কিংবদন্তি। ফলে শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অত্যন্ত প্রিয়পাত্রে পরিণত হন সমগ্র অঞ্চল জুড়ে। একজন মসজিদের ইমাম যাঁর পেছনে গ্রামের মানুষ নামাজ পড়েন আবার রাতভর তাঁর গান শুনে বেদনার সাগরে ডুবে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দেন—এমন বিরল ঘটনা বাউলসাধক উকিল মুন্সির বেলায়েই হয়তো প্রথম ও শেষ। যেমন—
ধরলাম পাড়ি বিষম দরিয়ায় দিন বন্ধু রে
ও বন্ধু রে
যারে তুমি পার করো
ডোবে না তরি তার
আবার কত সাধুজনায় ডুবে মারা যায়,
ভবদরিয়ায় ঢেউ দেখিয়া
প্রাণ আমার ওঠে কাঁপিয়া
সামনে ভীষণ আঁধার দেখা যায়। ঐ
বন্ধু রে
অকূলের কূল গো তুমি
অবান্ধবের বান্ধব তুমি
আবার শুনি তোমার নামের দয়ার সীমা নাই,
তুমি যারে দয়া করো
ভয় নাই অকূল সাগরে
ছাড়লাম তরি কূলেরই আশায়। ঐ
বন্ধু রে
ভাবের বৈঠা ধরল যারা
প্রেমের সারি গাইলো তারা
ভক্তি রসের বাদাম দিয়া যাইতেছে পার হইয়া,
বিশ্বাসে পাইল ধন
শুরুর পদ করে ভজন
উকিল শুধু রইলাম তোমার আশায়। ঐ
উকিল মুন্সির গানে বিমোহিত থাকতেন সর্বস্তরের মানুষ। কথিত আছে, উকিল মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি রাতভর গান করতেন—এ বিষয়কে সামনে এনে একটি কুচক্রীমহল রাতে পুলিশ পাঠিয়েছিল তাঁর কাছে, আর সেই পুলিশ রাতভর উকিল মুন্সির গান শুনে ভক্তে পরিণত হন।
আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে পুবালি বাতাসে
বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি আমারনি কেউ আসে রে। ঐ
যেদিন হইতে নয়া পানি আইলো বাড়ির ঘাটে সখী রে
অভাগিনীর মনে কত শত কথা উঠে রে। ঐ
গাঙে দিয়া যায় রে কত নায়-নাইওরির নৌকা সখী রে
মায়ে-ঝিয়ে বইনে-বইনে হইতেছে যে দেখা রে। ঐ
আমি যে ছিলাম গো সখী বাপের গলার ফাঁস সখী রে
আমারে যে দিয়া গেল সীতা-বনবাস রে। ঐ
আমারে নিল না নাইওর পানি থাকতে তাজা সখী রে
দিনের পথ আধলে যাইতাম রাস্তা হইতো সোজা রে। ঐ
কতজনায় যায় রে নাইওর এই না আষাঢ় মাসে সখী রে
উকিল মুন্সির হইবে নাইওর কার্তিক মাসের শেষে রে। ঐ
উকিল মুন্সি মোহনগঞ্জ থানার জালালপুর গ্রামে চাচার বাড়িতে থাকা অবস্থায় ওই গ্রামের হামিদা আক্তার (লাবুসের মা)-এর প্রেমে পড়ে যান। প্রেমের কারণে তাঁকে একসময় গ্রাম ছাড়তে হয়। লাবুসের মা’র বাবা লেবু হোসেন গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হওয়ায় উকিলের পছন্দকে তাঁর কোনো আত্মীয়-স্বজন মেনে নেননি। এসময় হামিদা খাতুনের প্রেমে পাগল উকিল রচনা করেন—
ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে
সোনার জালালপুর।
সেই খানেতে বসত করে
উকিলের মন চোর।
এরকম প্রেমপাগল উকিল মুন্সি অনেকদিন অতিবাহিত করেন হামিদাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। তখন পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ বিক্রয় করে প্রেমে জয়ী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোরেন সকলের দ্বারে দ্বারে। অবশেষ কারো সহযোগিতা না পেয়ে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে নিজেই বেছে নিয়েছিলেন মোহনগঞ্জ থানার জালালপুর গ্রামের হামিদা আক্তার (লাবুসের মা)-কে। অনেকের আপত্তি থাকার পরেও উকিলের বলিষ্ঠ প্রেম জয় করেছিল লাবুসের মাকে। সুদীর্ঘ বিবাহিত জীবনে দুই পুত্র ও দুই কন্যাসন্তানের জনক-জননী হয়েছিলেন তাঁরা। পুত্র আব্দুস ছাত্তার ও পুলিশ মিয়া, কন্যা সন্তোষের মা ও রাবেয়া খাতুন। দুই কন্যাকেই বিয়ে দিয়েছিলেন মোহনগঞ্জ থানার জৈনপুর গ্রামে। তাই মেয়েদের বাড়ির পাশেই স্থায়ীভাবে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটান বাউলসাধক উকিল মুন্সি।
উকিল মুন্সির ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় জ্ঞান ছিল অনেক গভীর। তাঁর ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, যুক্তিতে মানুষ নিজেকে খুঁজে পেত নিজের মতো করে। সমাজের প্রায় সবখানেই দোয়া দুরুদ পড়ার জন্য তাঁকে দাওয়াত করা হতো। এমনকি তাঁর এলাকার কোনো কোনো মানুষ মৃত্যুর আগে তাঁদের পরিবার-পরিজনকে বলে যেতেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন উকিলকে দিয়ে জানাজা পড়ানো হয়। কখনো এমন ঘটনাও ঘটেছে—গানের আসর থেকে উকিল জানাজা পড়াতে এসেছেন মানুষের অনুরোধে। তিনি জীবনে যা করেছেন দরদ দিয়েই করেছেন। যার স্বাক্ষর তাঁর গানে পাওয়া যায়—
ভাটির দেশের মাঝি ভাই রে
নাও বাইয়া যাও ভরা গাঙে দিয়া
বন্ধুর খবর জানলে তুমি
কইয়া যাও ভিড়াইয়া রে\\
আমার বাড়ির সামনে ভরা সুরমা নদী
আমি জল তুলিয়া স্নান করাইতাম আবার আসত যদি
আমি মিষ্ট মিষ্ট ফল রেখেছি বন্ধুয়ার লাগিয়া রে\\
আমি করি যার ভরসা সে পুরায় কার আশ
আমার চোখের পানি দূর হইল না কেবল বারোমাস
মিছা কলঙ্কিনী উকিল পিরিতি বাড়াইয়া রে\\
অন্যান্য ধর্মের প্রতিও ছিল উকিল মুন্সির শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে এবং রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে তৈরি করেছেন অসংখ্য গান—
আর কত দিনে রে শ্যাম আর কত দিনে
হইবে দেখা ভঙ্গিমাখা ঐ নিকুঞ্জবনে রে। ঐ
তুমি ছাড়া ঐ ঘরেতে রহিব কেমনে
দূরে ফেলে এ দাসী রে থাকবেননি মনে। ঐ
আইসো বন্ধু বইসো আমার হূদয় সিংহাসনে
নিশি পোহাইবো প্রেম আলাপনে রে। ঐ
কাতরে মিনতি করি নিবেদি চরণে
কাঙাল উকিলেরে রাখিও তোমার যুগল চরণে। ঐ
উকিল মুন্সির সুযোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তাঁরই এসএসসি পাস পুত্র স্কুলশিক্ষক আব্দুস ছাত্তার। শৈশব থেকে দেখা বাবার আধ্যাত্ম সাধনা এবং আদর্শ তাঁকে বাউল সাধনায় অনুপ্রাণিত করে। শুরু করেন গান, বাবার সাথে গান। গানে গানে আব্দুস ছাত্তারও শ্রেষ্ঠ এক বাউল শিল্পী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন ভাটিবাংলায়। পিতা-পুত্রের মালজোড়া গান, পাল্টাপাল্টি গানে আধ্যাত্মচিন্তার জগেক প্রসারিত করেছিলেন তাঁরা। আব্দুস ছাত্তার বাবার ইচ্ছাপূরণে ফুলবানুকে স্ত্রী হিসেবে ঘরে তুলেছিলেন। তাঁরাও সংসারজীবনে দুই পুত্র ও দুই কন্যাসন্তানের জনক-জননী। বুলবুল-কুলকুল দুই ছেলে, আলেয়া ও জুয়েল দুই মেয়ে। বুলবুল মামাবাড়ি কুলিয়াটিতে বসবাস করেন। কুলকুল ঢাকার উত্তরা আজমপুরে চায়ের স্টল করে দিনাতিপাত করেন। আলেয়া স্বামী-সন্তান নিয়ে নেত্রকোনায় আর জুয়েল স্বামী-সন্তান নিয়ে মোহনগঞ্জ বসবাস করছেন।
সাধক সম্রাট উকিল মুন্সির হূদয়ের সবটুকু উত্তাপ দিয়ে অর্জিত সম্পদ হামিদা আক্তার (লাবুসের মা)-এর মৃত্যু তাঁকে প্রচণ্ড আঘাত করে। মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়েন খুব। নিয়তির নির্মম পরিহাসে কিছুদিন যেতে না যেতেই তাঁর প্রিয় সন্তান, যাঁর সাথে তাঁর প্রচণ্ড সখ্য ছিল, ছিল ভাববিনিময়, গানের মানুষ আব্দুস ছাত্তারও দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে যান না ফেরার দেশে। এরকম দুটি বিচ্ছেদের ছোবল, উকিল মুন্সিকে গভীর বেদনায় নীল করে তোলে। বিচ্ছেদের সাগর বলে পরিচিত এই বাউল সাধক স্ত্রী-পুত্রের শোক আর বার্ধক্যের কাছে অবশেষে পরাজিত হন। ১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৩ বছর বয়সে হাজার হাজার ভক্তকে কাঁদিয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। জৈনপুরে বেতাই নদীর তীরে, পুত্রের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন বাউল সাধক আব্দুল হক আকন্দ উকিল মুন্সি।
১৭ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে গিয়েছিলাম বাউল সাধক উকিল মুন্সি ও আব্দুস ছাত্তারের সমাধিদর্শনে। এই কি বাউলসাধক উকিল মুন্সি ও আব্দুস ছাত্তারের বসতবাড়ি! দেখে চমকে যাবে যে কেউ চিরনিদ্রায় শায়িত কোটি মানুষের হূদয় জয় করা গানের স্রষ্টাদ্বয়ের শেষ ঠিকানা! যে দেশের প্রতিটি মানুষ তাঁদের গানের ভক্ত। প্রতিদিন কোটি মানুষ শোনেন তাঁদের গান। আসর জমে তাঁদের নামে। আর টেলিভিশন খুললে তো কথাই নেই! অনেক শিল্পীই প্রতিদিন তাঁদের গান করে, অর্জন করেন অর্থ, খ্যাতি ও যশ। আর মোহনগঞ্জের বেতাই নদীর তীরে ফুলবানু পরে আছেন শেষ স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার নিরন্তর সংগ্রামে। ফুলবানু ছাড়া কারো নজরে আসেনি চিরবিরহী বাউলদ্বয়ের করুণ আর্তনাদ। তারপরও আশার কথা হচ্ছে, ইদানিং দেশের স্বনামধন্য বাউলপ্রেমীদের হূদয়ে উকিল মুন্সির টান লেগেছে। অনেকেই যাচ্ছেন তাঁর সমাধির পাশে।